রুহুলের ছোটগল্প 'ব্যাধি'

  • 19 May
  • 03:44 PM

রুহুল আমিন, শিক্ষার্থী, বাংলা বিভাগ, জবি 19 May, 22

দ্বাদশবর্ষী রিপার শিয়রের কাছে বসে মাথায় জলপট্টি দিচ্ছে জননী রাবেয়া বেগম। সকাল থেকে মেয়ের জ্বর দেখে চিন্তিত তিনি। মনিকে ডেকে রিপার ঔষধগুলো আনতে বলে মেয়ের দিকে তাকালেন; জ্বরে কেমন শুকিয়ে গেছে মেয়েটা। রাবেয়া বেগমের ধমকে শিহরে উঠলেন মনি; 'এতোক্ষণ লাগে ঔষধ আনতে'। মা হারা মেয়ে মনি। বয়সে রিপার সমবয়সী। পেটের দায়ে এ বাড়িতে থেকেই কাজ করে। কখন সমস্ত কাজ শেষ করে দুই দিনের জ্বরাক্রান্ত দেহটাকে বিছানায় এলিয়ে দিতে পারবে সেটা ভাবতে ভাবতে রিপার ঔষধগুলো নিয়ে আসল সে। রাবেয়া বেগমের হাতে ঔষধগুলো আর পানির জগটা দিয়ে রান্নাঘরে পড়ে থাকা ময়লা থালাবাসনগুলো ধুয়ে মৃদু পায়ে সে তার ছোট্ট রুমটিতে চলে আসে। গুটানো মলিন বিছানাটাতেই ক্লান্ত শরীরটাকে এলিয়ে দিয়ে শুয়ে পড়ে। মাথাটা প্রচন্ড ব্যথা করছে, যেন অনেক ভারী কোনো বস্তু তার মাথায় চেপে বসেছে। সমস্ত শরীরের ব্যথা তাকে কাতর করে তুলছে, ব্যথার যন্ত্রনায় সে এপাশ ওপাশও হতে পারছেনা। কিন্তু শরীর আজ তার এতো ব্যথা করছে কেন! আজ তো রিপার অসুস্থতার জন্য রাবেয়া বেগম ধমক ছাড়া তার শরীরে হাতও তুলেনি। এসব সাত -পাঁচ ভাবনার মাঝেই একটা আবছায়া অবয়ব তার চোখের সামনে ভেসে উঠলো। এ তো তার মা! তাকে দেখে কেমন মিটিমিটি হাসছে। শেষবার তার মায়ের মুখটি দেখতে পেয়েছিল চার বছর আগে, যখন সাদা কাপড়ে মোড়ানো তার মায়ের নিথর দেহটাকে মানুষজন বাড়ি থেকে দূরে বাঁশঝাড়ের কাছে নিয়ে গিয়েছিল। মা তো তাকে বলতো এদিকটা ভালোনা, এদিকটায় যেন সে কখনো না আসে।তাহলে আজ সবাই মিলে তার মাকে এখানে কেন রেখে যাচ্ছে, মা ও তো তাদের কিছু বলছেনা! সবাইকে সে অনেক করে বলেছে মাকে একা ফেলে না যেতে, কিন্তু কেউ তার কথা শুনেনি। জোর করে তাকে সেখান থেকে নিয়ে আসে বাড়িতে। তার সপ্তাহখানেক পড়েই দূর সম্পর্কের এক খালা তাকে রিপাদের বাড়িতে দিয়ে যায়।তারপর থেকে সে তার মাকেও দেখতে পারেনি, মায়ের কবরের মাটিও স্পর্শ করে মায়ের শরীর গন্ধ অনুভব করতে পারেনি। বাবাকে তো জন্মের পর থেকেই দেখতে পারেনি সে; এতোদিন পরে আবার তার মা ফিরে এসেছে! তাকে আর কষ্ট করে এতো এতো কাজ করতে হবেনা, রাবেয়া বেগম তার শরীরে আঘাত করলে আচ্ছামতো ঐ মহিলাকে বকুনি দিয়ে দেবে তার মা।এসব ভাবতে ভাবতে তার মুখে মৃদু হাসির রেখা দোল খেলে গেল। মাকে সে প্রাণ খুলে অনেক কথা বলতে চায়, কিন্তু মুখ দিয়ে কোনো কথাই বের করতে পারছেনা। চোখ দুটিও কেমন আস্তে আস্তে বন্ধ হয়ে আসছে। আস্তে আস্তে মায়ের হাসিমাখা মুখটা কেমন অন্ধকারের আড়ালে লুকিয়ে পড়লো, যেমন করে রাতের আকাশের চাঁদটা মাঝে মাঝে মেঘের আড়ালে ডুব দিয়ে লুকোচুরি করে তার সাথে। কিন্তু তার মা যে তার সাথে লুকোচুরি করছেনা। তেলবিহীন প্রদীপের আলোটা যেমন মিটিমিটি জ্বলনীতে দোল খেয়ে নিভে যায়, তেমনি করে অন্ধকার রজনীতে মনির চোখ দুটিও শ্রান্ত হয়ে মুদে গেল। সকাল থেকেই রাবেয়া বেগমের মনটা অনেক ফুরফুরে। রিপার জ্বর রাতেই সেরে গেছে। কিন্তু এতো বেলা হয়ে গেছে, মনি এখনো ঘুম থেকে উঠছেনা কেন? মনিকে ডাকতে ডাকতে তার রুমের দিকে যেতে লাগলো রাবেয়া বেগম। রুমে ঢুকে কতক্ষণ ডাকার পরেও যখন উঠছেনা তখন মেঝেতে হাঁটু গেড়ে বসে জোরে একটা থাপ্পর দিলো। একি! পুরো শরীর যে তার বরফের চাকের মতো ঠান্ডা হয়ে গেছে। রাবেয়া বেগমের বুঝতে আর বাকি রইলোনা যে মনির প্রাণভোমরাটা তার ছোট্ট দেহটাকে ছেড়ে চলে গেছে না ফেরার দেশে। যেখানে কাজের জন্য কেউ তাকে আর প্রহার করবেনা। জ্বরাক্রান্ত শরীর নিয়ে ঔষধ দিতে দেরী হলে ধমক দেবেনা।