কন্যা শিশুর প্রতি সহিংসতা প্রতিরোধে পদক্ষেপ গ্রহণ করা জরুরি

  • 11 Oct
  • 08:15 PM

মোঃ আব্দুল্লাহ আলমামুন 11 Oct, 21

আজকের শিশু আগামী দিনের ভবিষ্যৎ। তারাই আগামী দিনের মানবসম্পদ। তাদের মাধ্যমে পরিচালিত হবে আমাদের বাংলাদেশ। কিন্তু শিশু বলতে ছেলে মেয়ে উভয়কে বোঝায়। প্রতিবছর কন্যা শিশুর প্রতি সম্মান জানাতে ১১ অক্টোবর আন্তর্জাতিক কন্যা শিশু দিবস পালন করা হয়। জাতিসংঘের অন্তর্ভুক্ত প্রত্যেক স্বাধীন দেশে আন্তর্জাতিক কন্যা শিশু দিবস পালন করা হয়। এই দিবস পালনের পিছনে রয়েছে দীর্ঘ সংগ্রাম ও ইতিহাস।

প্ল্যান ইন্টারন্যাশনাল নামের বেসরকারী অনুষ্ঠানের পৃষ্ঠ-পোষকতাতে একটি প্রকল্প রূপে আন্তর্জাতিক কন্যা শিশু দিবসের জন্ম হয়েছিল । প্ল্যান ইন্টারন্যাশনাল "কারণ আমি একজন মেয়ে" নামক আন্দোলনের ফলশ্রুতিতে এই দিবসর ধারণা জাগ্রত হয়েছিল। এই আন্দোলনের মূল কার্যসূচী হল গোটা বিশ্বজুড়ে কন্যার পরিপুষ্টি সম্পর্কে জনসচেতনতা বৃদ্ধি করা। এই সংস্থার কানাডার কর্মচারীরা সকলে এই আন্দোলনকে বিশ্ব দরবারে প্রতিষ্ঠা করতে প্রথমে কানাডা সরকারের সহায়তা নেয়। পরে রাষ্ট্রসংঘের সাধারণ সভার মধ্যে কানাডায় আন্তর্জাতিক কন্যা শিশু দিবস উদযাপনের প্রস্তাব শুরু হয়।

২০১১ সালের এই প্রস্তাব রাষ্ট্রসংঘের সাধারণ সভায় গৃহীত হয় ও ২০১২ সালের ১১ অক্টোবর তারিখে প্রথম আন্তর্জাতিক কন্যা শিশু দিবস পালন করা হয়। প্রতি বছর আন্তর্জাতিক কন্যা শিশু দিবসের একটা প্রতিপাদ্য থাকে। প্রথম কন্যা শিশু দিবসর প্রতিপাদ্য ছিল "বাল্য বিবাহ বন্ধ করা"। এবছরের আন্তর্জাতিক কন্যা শিশু দিবসের প্রতিপাদ্য হচ্ছে, ডিজিটাল প্রজন্ম, আমাদের প্রজন্ম। অর্থাৎ আমাদের সমাজে পুরুষের তুলনায় নারীরা তথ্য, ইন্টারনেটে ব্যবহারে পিছিয়ে আছে।

জাতিসংঘের অন্যান্য দেশের মতো আমাদের দেশে প্রতি বছর ১১ অক্টোবর দিবসটি পালন করা হয়। কিন্তু গোটা বিশ্বে ২০১৯ সালের শেষ পর্যায়ে মহামারি করোনা ভাইরাসের প্রাদুর্ভাব দেখা দেয়। ফলে সকল প্রকার অফিস, আদালত, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে যায়। বাংলাদেশে ১৫ মার্চ ২০২০ থেকে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়। কিন্তু মার্চ ২০২০ থেকে অক্টোবর ২০২১ পর্যন্ত শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকায় দেশে অনেক কন্যা শিশু বাল্যবিবাহের শিকার হয়েছে। তাদের উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ উপেক্ষা করে সাংসারিক জীবনে প্রবেশ করেছে। আমাদের সমাজে পুরুষের তুলনায় নারীরা পিছিয়ে থাকে। তারা সবসময় নানা বৈষম্যের শিকার হয়। কিন্তু লিঙ্গ বৈষম্য দূর করা এই দিবস পালনের প্রধান উদ্দেশ্যে। অন্যান্য ক্ষেত্রেও বৈষম্যের শিকার হয়ে থাকে। যেমন, শিক্ষার অধিকার, পরিপুষ্টি, আইনি সহায়তা ও ন্যায় অধিকার, চিকিৎসা সুবিধা, ও বৈষম্য থেকে সুরক্ষা, নারীর বিরুদ্ধে হিংসা, নারী শিক্ষা, নারী নির্যাতন প্রতিরোধ ও বলপূর্বক তথা বাল্যবিবাহ। বর্তমান সমাজে বাল্যবিবাহ ও যৌতুক প্রথা প্রতিনিয়ত বেড়েছে চলেছে। বাংলাদেশে মেয়েদের ১৮ বছরের নিচে বিয়ে দিলে তাকে বাল্যবিবাহ বলে। কিন্তু আমাদের সমাজে ১২ বছর থেকে শুরু করে কন্যা শিশুদের জোরপূর্বক বিয়ে দেওয়া হয়। এতে কন্যা শিশু যেমন শারীরিক নির্যাতনের শিকার হয়, তেমনি মানসিক নির্যাতনের শিকার হয়। এতে তার পড়াশুনা তো বন্ধ হয়ে যায়, পাশাপাশি তার উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ অঙ্কুরে নষ্ট হয়ে যায়। শুধু তাই নয়, বিয়ের পরে শ্বশুর বাড়ি থেকে যৌতুকের আবদার করে। আর কনে যদি বাপের বাড়ি থেকে যৌতুকের টাকা, আসবাবপত্র আনতে না পারে তাকে নির্যাতন করে।

যে কন্যা শিশুর এখন পড়াশোনায় ব্যস্ত থাকার কথা সে সংসারের হাল ধরে। যেখানে মহা মনীষী নেপোলিয়ন বলেছিলেন, আমাকে একটা শিক্ষিত মা দাও, আমি একটি শিক্ষিত জাতি দেব। কিন্তু বাল্যবিবাহের কারণে কন্যা শিশুদের পড়াশোনা বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। একজন মা যদি শিক্ষিত না হয়, তাহলে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের শিশুরা তাদের কাছে থেকে কি শিক্ষা লাভ করবে?সামাজিক, রাজনৈতিক কর্মক্ষেত্র সহ সমস্ত স্থানে নারী পুরুষের ভেদাভেদ দূরীকরণ হল কন্যা শিশু দিবস অন্যতম উদ্দেশ্য। সমাজে বাল্যবিবাহ রোধ করা সম্ভব হয় নি, সেখানে নারী নির্যাতন বন্ধ করা অনেকটা দুরুহ। একটি শিশু সম্পূর্ণ নারী হয়ে ওঠার জন্য শারীরিক ও মানসিক পূর্ণতার পাওয়ার আগেই জোর করে বিবাহ দিয়ে দেওয়া হয়। আমাদের সমাজে কিছু প্রচলিত কুসংস্কার আছে। পিতামাতা পরিবারের বোঝা হালকা হওয়ার উদ্দেশ্য নিয়েই এই কাজের পরিসমাপ্তি ঘটে এবং তার সাথে সাথে একটি শিশুর অথবা একজন নারী তার মানসিক ইচ্ছা-অনিচ্ছার সিদ্ধান্ত গ্রহণের অপমৃত্যু ঘটে। বাল্যবিবাহের মত সামাজিক ব্যাধি সমাজ থেকে দূর করার জন্যই কন্যা শিশু দিবস এর মত দিবসে কঠোর প্রতিজ্ঞা গ্রহণের অঙ্গীকার নেওয়া হয়। কন্যা শিশু ছেলেদের মতো পড়াশোনা করতে পারে সে বিষয়ে সচেতন হতে হবে এবং পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে।

লেখক: মোঃ আবদুল্লাহ আলমামুন
শিক্ষার্থী, সমাজবিজ্ঞান বিভাগ
জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা