পরিস্থিতির কাছে হার না মেনে পাবলিকার হওয়ার গল্প

  • 24 Feb
  • 02:38 PM

মোঃ রানা হোসেন সাগর,শিক্ষার্থী, আইন বিভাগ,জবি 24 Feb, 22

২১ বছরের জীবনে অনেক মানুষ জীবনের গল্প পড়েছি এবং তার থেকে অনুপ্রেরণা নিয়েছি। আমাকে অন্য কারো গল্প নয় আজকে আমি উপস্থাপন করবো নিজের জীবনের গল্প।

আমি মোঃ রানা হোসেন সাগর। বাড়ি রংপুর জেলার পীরগঞ্জ উপজেলার টুকুরিয়া গ্রামে। আমার জীবনে অনেক উত্থান পতনের মধ্য দিয়ে আজকে জীবনের গুরুত্বপূর্ণ একটি সিঁড়িতে আসতে পেরেছি। ছোট বেলা থেকে ছিলাম দুরন্ত স্বভাবের। গ্রামের বাকী ছেলেদের মতো সারাদিন খেলাধুলা ঘোরাঘুরি দিয়েই দিন কেটে যাইত। তবে আমি বরাবর গনিতে ভালো ছিলাম। সব ক্লাসে কেনো জানি গনিতে সবার থেকে বেশিই নাম্বার পেতাম। কারণ আমার গনিতের ভিত্তি গড়ে দিয়েছিল আমার বড় ভাই মোঃ ইমরান হোসেন। পঞ্চম শ্রেনী পর্যন্ত কোনো রকম পিএসসি ৪.৭১ নিয়ে শেষ করছি। জীবনের মোড় ঘুরে গেছে ষষ্ঠ শ্রেনীতে এসে। আমার জীবনের শ্রেষ্ঠ শিক্ষাগুরু মোঃ আব্দুল কুদ্দুস স্যার ক্লাসে গনিতে আমার এত আগ্রহ দেখে প্রথম তিনি আমাকে জীবনে এগিয়ে যাওয়ার পরামর্শ দিতে থাকেন। ওনার ১ ঘন্টার কথাতে আমার মধ্যে অন্য রকম শক্তি চলে আসে। আমি নিয়মিত পড়াশোনা করতে থাকি। আলহামদুলিল্লাহ ৮ম শ্রেনী পর্যন্ত প্রথম ছিলাম। এরপর জেএসসিতে ৫.০০ অর্জন করি। গ্রামের স্কুলেই নবম শ্রেনীতে ভর্তি হই। পড়াশোনার পাশাপাশি রিলেশনশিপে নিজেকে জড়িয়ে ফেলি। মোটামুটি ক্লাসের প্রথম থেকে ৩ নাম্বার ব্যবধানে তৃতীয়তে চলে আসি।তারপর রিলেশনের ইতি টেনে দশম শ্রেনীতে উঠে আবারও মনোযোগ দিয়ে পড়াশোনা শুরু করি। সব ঠিকঠাক থাকলেও ভাগ্য দোষে আবারও রেজাল্ট এসএসসিতে (২০১৭) খারাপ করি। নিজের রেজাল্ট দেখে নিজেই অবাক হই ৪.৭৩। তখন এটা নিশ্চিত আমার ডাক্তার বা বড় স্বপ্ন শেষ। এরপর সিদ্ধান্ত নিই যে পলিটেকনিক থেকে পড়াশোনা করে বিএসসি ইঞ্জিনিয়ারিং করবো। পরিকল্পনা মতে ঠাকুরগাঁও পলিটেকনিক এ ফুড ইঞ্জিনিয়ারিং এ ভর্তি হই। সেখানে নানাবিধও সমস্যা এবং পরিবেশের সাথে নিজেকে মানাতে না পারায় ৬ মাস পর চলে আসি। একদিকে মানসিক যন্ত্রণা অপর দিকে বারবার স্বপ্ন ভঙ্গ। পারিবারিক নানা সমস্যার সম্মুখীন হতে হয় এই সময়। একদিকে পারিবারিক প্রচন্ড আর্থিক সমস্যা অন্য দিকে এক বছর পিছিয়ে অনেকটা হতাশা কাজ করতো সর্বদা। তারপর অনেক ভেবে চিন্তে পুনরায় ঘুরে দাড়ানোর প্রত্যয় নিয়ে জীবনের নতুন লক্ষ্য ঠিক করে ঢাবিকে উপলক্ষ্য বানিয়ে কমার্স নিয়ে ২০১৮ সালে আবারও সরকারি শাহ সুলতান কলেজ,বগুড়া ভর্তি হই। জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সময় বড় ভাই নিজের কাছে যেভাবে যত্নে রেখে অনুপ্রেরণা দিয়েছে তার অবদান কখনও ভুলার মতো না। ভর্তির একাদশ শ্রেনী থেকেই ভর্তি প্রস্তুতি নিতে থাকি। নিজের খরচ বাঁচিয়ে প্রচুর একাডেমিক বই কিনে পড়তে থাকি। পাশাপাশি পুরাতন লাইব্রেরি থেকে কম টাকায় ভর্তি সহায়ক বই কিনে পড়তাম নিজে নিজে। আলহামদুলিল্লাহ কলেজে বরাবর সব পরিক্ষায় প্রথম স্থান অর্জন করি। কলেজ জীবনে সব শিক্ষকই সব ধরণের সহযোগিতা করতো। কারণ কোনোকিছু না বুঝলেই শিক্ষকদের নিকট যেতাম বুঝার জন্য। বিশেষ করে ( বিভাগীয় প্রধান সামছুল হক মন্ডল স্যার, আরিফ স্যার,মাহবুব স্যার,রব্বানী স্যার) এনাদের অবদান কখনও ভুলার মতো না। সব থেকে বড় অনুপ্রেরণা কাজ করতো বাংলা ম্যামের কথা শুনে। ওনি ক্লাসে সবার সামনে যখন বলতো রানা জীবনে অনেক বড় কিছু হবে আমার ১০০% বিশ্বাস তোমরা দেখে নিও সবাই। তখন আমি কেনো যে কারো আত্মবিশ্বাস হাজার গুন বেড়ে যেতো। আমিও ম্যামের কথাকে পুঁজি করে পড়াশোনা করতাম । করোনার মাঝেে পড়াশোনা ধরে রাখা কঠিন ছিলো। একদিকে পরিক্ষার চিন্তা অন্যদিকে ভর্তি প্রস্তুতি। গ্রামে পড়াশোনার যে পরিবেশ সবাই জানে বাসায় থাকলে কি রকম পড়াশোনা হয়। তারপর অবশেষে অটো রেজাল্টে জিপিএ ৫.০০।

তারপর ভর্তি প্রস্তুতি সময় -

কলেজ টপার হওয়াতে বেশ কিছু কোচিং অফার করছিলো তাদের কোচিং এ বিশেষ ছাড়ে ভর্তি হতে। অনেক ভাবার পর UCC কোচিং সেন্টারে বিনামূল্যে আমিসহ মোট তিন জনকে ভর্তি নেয় (১ম,২য়,৩য়)। করোনাকে অনলাইন ক্লাস দেওয়াতে আমাদের থেকে টাকা চাইলে আমি ও সাব্বির ভর্তি বাতিল করি। কারণ টাকা দিয়ে কোচিং করার অবস্থায় তখন ছিলাম না। জীবনের সব থেকে কষ্টের জীবন কাটাইছি (২০১৭ - ২০২০)। আর্থিক সমস্যা এত পরিমাণ ছিলো যা বলার মতো না । তবুও মা-বাবা বলে কথা অনেক কষ্ট হলেও পড়াশোনা চলার মতো টাকার ব্যবস্থা করে ঠিকই দিতো। নানাবিধ সমস্যার কারণে (২০১৬-২০২০) পারিবারিক আর্থিক অবস্থায় এতটা নিম্ন পযার্য়ে চলে গিয়েছিল যে কখনও কল্পনা করতে পারি নি এমন খারাপ সময় আসবে আমাদের।এই সময় এতটাই সাধারণ জীবনযাপন করতে হইছে পাঁচ টাকা খরচের সময়ও দশবার ভাবতাম উচিত হবে কিনা।

নিজের মনোবল ধরে রাখা অনেক কঠিন ছিলো। তারপরও নিজের অনেক কষ্টে নিজের মনোবল ধরে রেখে বাসায় বসে বসে পড়াশোনা করতে থাকি।
সবকিছুই ঠিক থাকলেও ভর্তি পরিক্ষা দিতে পেরেছিলাম তিনটি( ঢাবি,রাবি,গুচ্ছ)।
বরাবরের ভাগ্য খারাপ থাকায় আর লিখিত পরিক্ষার জন্য চর্চা না করায় ঢাবিতে লিখিত পরিক্ষায় মোটামুটি সব কমন থাকার পরও সময় মেইনটেইন করতে না পারায় ২৫ নাস্বার উত্তর লিখতে সময় শেষ হয়ে যায়। চরম হতাশা কাজ করে। ভয় কাজ করতে থাকে এই বুঝি সব আশা এখানেই শেষ। বহুনির্বাচনি অংশে ভালো নাম্বার পেলেও লিখিত অংশে ৪০ এর মধ্যে ১২ নাম্বার পাই। সিরিয়াল চলে যায় ২২০০+। আবারও বুকের মধ্যে প্রচন্ড ধাক্কা লাগে।
মূলত ঢাবি কেন্দ্রীয় প্রস্তুতি নেওয়ায় অন্য ভার্সিতে পরিক্ষায় ততটা মনোযোগ দেওয়া হয় নি। তারপরও আলহামদুলিল্লাহ রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে এবং গুচ্ছে আশানুরুপ ফলাফল করতে সক্ষম হয়। সব কিছু ছাপিয়ে আলহামদুলিল্লাহ বর্তমান জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে আইন নিয়ে ভর্তি আছি। এখন নিজের মধ্যে অন্য রকম ভালো লাগা কাজ করে। এখন আবার নতুন করে নতুন স্বপ্ন জয়ের আত্মবিশ্বাস পাই।

এডমিশন পরিক্ষার্থীদের প্রতি পারামর্শঃ
শিক্ষার্থীদের প্রতি আমার পরামর্শ থাকবে জীবনের অনেক বাধা আসবে। একটা কথা মাথায় রাখবেন পিছু টেনে ধরার লোকের অভাব নাই। কারো কথায় কান না দিয়ে নিজের মতো স্বপ্নপানে ছুটতে হবে। সবকিছ